এক বর্ষণ মুখর সন্ধ্যা। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। চারদিকে পানিতে থৈ থৈ। হঠাৎ করে বাবা অসুস্থ। বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হবে। কিন্তু সে অবস্থাও নেই। প্রায় হাঁটুর উপরে পানি। এর মধ্যেই কোনো রকমে ধরাধরি করে বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এরপর প্রতিজ্ঞা করেন এলাকার মানুষের জলাবদ্ধতা নামক এই দুর্ভোগ লাঘব করবেন। খুব অল্প সময়ে মানুষের সেবা করার সেই সুযোগ পান। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিরসন করেছেন এলাকার জলাবদ্ধতা। এখন আর অল্প বৃষ্টিতে হাঁটু সমান পানি হয় না। নির্বিঘ্নে চলাচলা করা যায়। বলছি নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা ইউনিয়নের কথা। যেখানে সামান্য বৃষ্টি পড়লেই এমন চিত্র দেখা যেতো।
কিন্তু বর্তমানে পাল্টেছে দৃশ্যপট। এখন আর নেই সেই জলাবদ্ধতা। আর এই কাজটি করেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা জাতীয়তাবাদী তাঁতি দলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বল। তিনি মরহুম সিরাজুল ইসলাম খানের পুত্র। তিনি ছাড়াও তার আরো দুই ভাই রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছেন। তারা হলেন- মো. হাছান ইমাম সম্রাট (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ফতুল্লা ইউনিয়ন ৬নং ওয়ার্ড বিএনপি) ও মো. মিঠু খান (সভাপতি ৫নং ওয়ার্ড যুব দল, ফতুল্লা ইউনিয়ন)।
জানা যায়, ফতুল্লা ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে জুড়ি খাল। খালটি ফতুল্লার রেললাইন থেকে শুরু করে আদাবর পুল পর্যন্ত বিস্তৃত। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ কিলোমিটার। খালটি ইউনিয়নের লালপুর, পৌশার পুকুরপাড়, টাকারপাড়, গাবতলী, কাপইড়া পট্টি, উত্তর মাসদাইর, পশ্চিম ইসদাইর, পূর্ব ইসদাইর, বুড়ির দোকান, সস্তাপুর, কোতালের বাগসহ আরো বেশ কিছু জায়গা দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
এই খালটি নানা রকম ময়লা আবর্জনা দিয়ে ভরতি ছিল। পলিথিন, বোতল, প্লাস্টিকের নানা রকম আবর্জনায় ছিল পরিপূর্ণ। যার ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি আটকে আশেপাশের রাস্তাগুলোতে পানিতে ডুবে যেত। এমন অবস্থায় কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারি উদ্যোগে খালটি সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এরপর জুলাই আন্দোলন ও ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শুরু হয়। এরপর ২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ক্ষমতায় আসে। নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। তাঁর একান্ত চেষ্টা ও সার্বিক সহযোগিতায় ফতুল্লা অঞ্চলের জলাবদ্ধতা দূর করেন সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বল। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খালের সংস্কার কাজ করেন। কিছু জায়গায় খুঁটি পুঁতে বাঁধ দেন আর কিছু জায়গায় কনক্রিট দিয়ে মেরামত করেন।
তার এই উন্নয়নের ফলে এলাকার মানুষের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি। অল্প বৃষ্টিতেই আর জলাবদ্ধ হয় না এলাকা। নির্বিঘ্নে যাতায়ত করা যাচ্ছে। ভারি বৃষ্টি হলেও এখন আর পানি আটকে থাকছে না। শুধু সংস্কার করেই ক্ষান্ত হননি। নিয়িমিত খালের দেখাশোনা করেন তিনি। যাতে কেউ খালে ময়লা আবর্জনা না ফেলে সেজন্য মানুষকে সচেতন করেন।
এলাকার প্রবীণ মো. ইমাম হোসেন বলেন, আমরা বহুদিন বঞ্চিত ছিলাম। অনেক ভোগান্তিরও শিকার হয়েছি। প্রতিটি বর্ষায় আমরা অনেক পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। সামান্য বৃষ্টিতে ঘর থেকে বের হওয়ার অবস্থা ছিল না। এই খালটি দিয়ে সিটি কর্পোরেশন, পঞ্চবটি, তাগার পাড়সহ ফতুল্লার ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের পানি প্রবাহিত হয়। আগে ৩০মিনিট বৃষ্টি হলেই আমরা ঘর থেকে বের হতে পারতাম না। কিন্তু বর্তমানে সেই জলাবদ্ধতা আর নেই। আমাদের এলাকার একজন ভালো মানুষ মো. সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বল আমাদের খালটি সংস্কার করেছেন। শুধু খাল নয়, খালের সাথে সংযুক্ত ড্রেনগুলোও পরিষ্কার করেছেন। এখন আর সেখানে পানি আটকে থাকে না।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তোলারাম কলেজের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ইদ্রিস আলী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন পর্যন্ত অবহেলিত ছিলাম। আমাদের পানি চলাচলের একমাত্র খালটি অচল অবস্থায় ছিল। এলাকার মানুষকে অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এই দুর্ভোগ থেকে অবসান করার একমাত্র কারিগর হলেন সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বল। দিনরাত এক করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে তিনি খাল খননের কাজটি করেছেন। এই এলাকার মানুষ এখন জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। তারা শান্তিতে চলাফেরা করতে পারছে।
জানতে চাইলে মো. সিদ্দিকুর রহমান উজ্জ্বল বলেন, আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম এলাকার মানুষের এই দুর্ভোগ লাঘব করবো। আমি শুধু আমার প্রতিজ্ঞা বাস্তবতায় করেছি। আমি চেষ্টা করেছি এবং শেষ পর্যন্ত সফল হয়েছি। জেলা পরিষদ প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আমাকে সহযোগিতা করেছে। এলাকাবাসীর কথা না বললেই নয়, তারা সব সময় আমার পাশে ছিল, এখনো আছে।
তিনি আরো বলেন, আমি সংস্কার করে দিয়েছি। এখন এটা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এলাকাবাসীর। আপনাদেরকে এটা দেখে রাখতে হবে, পরিচর্যা করতে হবে। নাগরিক পর্যায়ে সচেতনতা ছাড়া এই খাল রক্ষা সম্ভব হবে না। এলাকাবাসী যদি সচেতন হয়, খালে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে তাহলেই ভালো থাকবে খাল। নিজে সচেতন হতে হবে এবং অন্যকেও সচেতন করতে হবে। কেউ যেনো খালে আবর্জনা না ফেলে সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এলাকাবাসীর।
