বাবাকে মারধরের দৃশ্য দেখে কেঁদেছিল ৯ বছরের তুবা, এবার তিন মাসের জন্য বাবাকে বিদায়
বরিশালের উজিরপুরে চুরির অপবাদে এক ব্যক্তিকে বেঁধে মারধরের অভিযোগকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে সেই ঘটনার সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য হয়ে উঠেছে ছোট্ট মেয়ে তুবা বিনতে অরণির বাবার প্রতি ভালোবাসা।
‘আমার বাবা ভালো বাবা, তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে’—কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছে বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা বিনতে অরণি।
মাত্র কয়েকদিন আগেও যে মেয়েটি বাবার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মারধরের দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছে, সেই মেয়েকেই এবার বাবাকে তিন মাসের জন্য বিদায় জানাতে হয়েছে।
সোমবার দুপুরে বাবাকে বিদায় দেওয়ার সময় তুবার একটাই চাওয়া—বাবা সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন, সংসারে কাজ করে সন্তানদের ভালো রাখুন।
যেভাবে শুরু ঘটনাটি
গত শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত বামরাইল এলাকায় তুবার বাবা অনিক সরদারকে চুরির অপবাদ দিয়ে কয়েকজন ব্যক্তি বেঁধে রেখে মারধর করেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, খবর পেয়ে তুবা, তার মা ও ছোট বোন ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।
সেখানে গিয়ে তুবা দেখতে পায়, তার বাবাকে বেঁধে রাখা হয়েছে এবং তাকে মারধর করা হচ্ছে।
তুবার ভাষায়—
‘আমি গিয়ে দেখি বাবাকে বেঁধে রেখে মারছে সবাই, লাঠি দিয়া বাড়ি দিচ্ছে, লাত্থি দিচ্ছে।’
বাবাকে মারধর না করার জন্য সেখানে থাকা লোকজনের কাছে বারবার অনুরোধ করে তুবা। কিন্তু তখনও তার বাবাকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি।
ক্ষুধার্ত বাবার মুখে খাবার তুলে দেয় মেয়ে
মারধরের একপর্যায়ে অনিকের ক্ষুধা লাগলে একজন তাকে চা ও রুটি দেন।
বাবার হাত-পা তখনও বাঁধা।
সেই অবস্থাতেই ছোট্ট তুবা নিজের হাতে বাবাকে চা ও রুটি খাওয়ায়।
এই দৃশ্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে শিশুটির বাবার প্রতি মমতা এবং অসহায় অবস্থায় তাকে খাবার খাওয়ানোর দৃশ্য মানুষের নজর কাড়ে।
তুবার ভাষায়,
‘দেখতে পাই বাবার খুব খুধা লাগছে। তখন একজন চা আর রুটি দিলে তা বাবাকে খাওয়াইয়া দেই।’
পরে অনেক অনুরোধের পর অনিককে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বাড়িতে ফেরার পর বাবাকে ফিরে পেয়ে তুবা খুশি হলেও বাবার শারীরিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার উদ্বেগ কাটেনি।
‘চুরির কোনো মালামাল উদ্ধার হয়নি’
অনিক সরদারের দাবি, তার বিরুদ্ধে চুরির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ তাকে দেখানো হয়নি।
তিনি বলেন,
‘আমার কাছ থেকে চুরির কোনো মালামাল যেমন উদ্ধার হয়নি, তেমনি কোনো প্রমাণও দেখাতে পারেনি।’
অনিকের অভিযোগ, জমি ও পূর্বশত্রুতার বিরোধের জেরেই তাকে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।
তবে তাকে মারধরের অভিযোগে কারা জড়িত এবং চুরির অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি কী ছিল—এসব বিষয়ে আইনগতভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পরিষ্কার নয়।
বাবাকে নিয়ে তুবার আকুতি
বাবাকে ফিরে পাওয়ার পর তুবার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—তার বাবা যেন নতুন করে জীবন শুরু করতে পারেন।
তুবা বলছে, বাবা কোনো অন্যায় করে থাকলেও যেন তার সঙ্গে অন্যায় না হয়। আর যদি তিনি সুস্থ হয়ে একটি কাজ করতে পারেন, তাহলে পরিবারের কষ্ট অনেকটাই দূর হবে।
তুবার ভাষায়,
‘এখন বাবারে একটা কর্মের কিছু করে দিলে আমরা সবাই মিলে ভালো থাকতে পারব।’
এই ছোট্ট মেয়েটির কথাতেই উঠে এসেছে পরিবারটির আর্থিক অনিশ্চয়তার চিত্র।
তিন মাসের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রে অনিক
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসার পর বিষয়টি নজরে আসে স্থানীয় প্রশাসনের।
উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অনিক শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ থাকায় তার চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সোমবার পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে একটি মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি প্রায় তিন মাস থাকবেন বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানিয়েছেন, এই সময়ে অনিকের পরিবারের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে।
অনিকের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি তার পরিবারের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
‘মানুষ শুধু বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসা দেখেছে’
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা বলেন,
‘অনিকের ঘটনায় মানুষ কোনো কিছুই ভাবেনি, শুধু বাবার প্রতি মেয়ের ভালোবাসার বিষয়টি দেখেছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি যে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আবেগ তৈরি করেছে, প্রশাসনের বক্তব্যেও তার প্রতিফলন দেখা গেছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সহযোগিতায় পরিবারটি এখন অনিকের সুস্থ হয়ে ফিরে আসার অপেক্ষায়।
অনিককে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর সময় পরিবারটিকে স্থানীয়ভাবেও আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
এখন তুবার অপেক্ষা
একদিকে বাবার ওপর নির্যাতনের অভিযোগ, অন্যদিকে চুরির অভিযোগের সত্যতা নিয়ে অনিকের অস্বীকার—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখনো আলোচনায়।
তবে এসব বিতর্কের বাইরে সবচেয়ে বেশি মানুষের নজর কেড়েছে তুবার বাবার প্রতি ভালোবাসা।
যে বাবা কয়েকদিন আগে মেয়ের চোখের সামনে মারধরের শিকার হয়েছেন, সেই বাবাকেই এবার সুস্থ জীবনে ফেরার আশায় তিন মাসের জন্য বিদায় দিয়েছে তুবা।
বাবাকে বিদায় দেওয়ার সময় ছোট্ট তুবার চোখে পানি, কণ্ঠে আকুতি—
‘আমার বাবা ভালো বাবা। মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে।’
এখন পরিবারের প্রত্যাশা—তিন মাস পর অনিক সুস্থ হয়ে ফিরবেন, একটি কাজ পাবেন এবং আবার সন্তানদের নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন।
সামালা টিভি | বরিশাল প্রতিনিধি
