এক সকালেই ধসে পড়েছিল নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসই বদলে দেয়নি, পাল্টে দিয়েছে বৈশ্বিক নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির গতিপথ। ২৫ বছর পরও সেই হামলার অভিঘাত বিশ্বজুড়ে অনুভূত হচ্ছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট। নিউইয়র্ক তখন ছিল অন্য সব দিনের মতোই ব্যস্ত—অফিসগামী মানুষের ভিড়, স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি, রাস্তায় যানজট। কেউ জানতেন না, কয়েক মিনিটের মধ্যেই ইতিহাসের গতিপথ বদলে যাবে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল হামলা
সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে আমেরিকান এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১১ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নর্থ টাওয়ারে আঘাত হানে। প্রথমে অনেকেই ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে মনে করেছিলেন।
কিন্তু মাত্র ১৭ মিনিট পর, সকাল ৯টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ১৭৫ সাউথ টাওয়ারে আঘাত করলে স্পষ্ট হয়ে যায়—এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা।
এরপর নিউইয়র্কজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। আকাশে আগুনের কুণ্ডলী, রাস্তায় ধুলার মেঘ, ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষের আর্তনাদ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।
চার উড়োজাহাজ, ১৯ ছিনতাইকারী
সেদিন মোট চারটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ছিনতাই করা হয়। এর মধ্যে দুটি উড়োজাহাজ নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ারে আঘাত হানে।
তৃতীয় উড়োজাহাজটি আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে। আর চতুর্থ উড়োজাহাজটি পেনসিলভানিয়ার একটি এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়, যাত্রীদের প্রতিরোধের কারণে সেটি নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পারেনি।
এই চারটি উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনায় মোট ১৯ জন ছিনতাইকারী জড়িত ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
বদলে যায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তানীতি
৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে আফগানিস্তানে এবং ২০০৩ সালে ইরাকে সামরিক অভিযান চালানো হয়।
পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক সংঘাত ও ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান এবং আঞ্চলিক জোটনীতির প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বহু দেশে।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ারই ধারাবাহিকতায় আজকের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনাকেও অনেকে দেখছেন। প্রশ্ন উঠছে—সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে যুক্তরাষ্ট্র যে বৈশ্বিক সামরিক কাঠামো তৈরি করেছিল, তা কি শেষ পর্যন্ত নতুন সংঘাতের পথ তৈরি করেছে?
হামলার দিন যুক্তরাষ্ট্র কেমন ছিল?
৯/১১-এর দিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন ছিল স্বাভাবিক। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তখন ক্ষমতায় মাত্র নয় মাস। নিউইয়র্কের মেয়র রুডি জুলিয়ানির মেয়াদও শেষের দিকে ছিল।
সেদিন নিউইয়র্কে প্রাইমারি নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। সকাল ৬টায় ভোটকেন্দ্র খোলার কয়েক ঘণ্টা পরই হামলা শুরু হয়। শহরের স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম মুহূর্তেই থমকে যায়।
২৫ বছর পরও অমীমাংসিত প্রশ্ন
প্রতি বছর ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে নিহতদের নাম পাঠ করা হয় এবং নীরবতা পালন করা হয়। নিহতদের স্মরণে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন কর্মসূচি।
তবে হামলার ২৫ বছর পরও এর রাজনৈতিক প্রভাব, গোয়েন্দা ব্যর্থতা, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক হস্তক্ষেপ এবং পরবর্তী যুদ্ধগুলোর দায় নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি।
একটি সন্ত্রাসী হামলা কীভাবে বৈশ্বিক রাজনীতি বদলে দিতে পারে, ৯/১১ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আর সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আজও প্রশ্ন রয়ে গেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে এমন এক সামরিক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা শেষ পর্যন্ত তার নিজের জন্যই নতুন সংকট ডেকে এনেছে?
সামালা টিভি | আন্তর্জাতিক ও বিশেষ প্রতিবেদন ডেস্ক
