চেক ডিজঅনার মামলায় পাওনা পরিশোধ ও সমঝোতা হলে কারাদণ্ড নয়: হাইকোর্ট
চেকের পুরো টাকা ও ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে আপস-মীমাংসা হলে চেক ডিজঅনার মামলায় কারাদণ্ড বাতিল করা যেতে পারে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
ন্যাশনাল পেমেন্ট ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের (এনআই অ্যাক্ট) ১৩৮ ধারায় দায়ের করা একটি ক্রিমিনাল আপিল নিষ্পত্তি করে বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ সিদ্ধান্ত দেন।
‘মো. আবদুল হান্নান মাস্টার বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় গত ৬ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়।
এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল
মামলায় দণ্ডিত আবদুল হান্নান মাস্টার চেকের পাওনা অর্থ পরিশোধ এবং ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের সঙ্গে আপস-মীমাংসা করায় তার এক বছরের কারাদণ্ড বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।
তবে আদালত তার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন এবং অর্থদণ্ড ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা থেকে কমিয়ে ২৮ হাজার ১২৫ টাকা করেছেন। এই অর্থ চেকের মূল অঙ্কের সমপরিমাণ।
একই সঙ্গে অধস্তন আদালতে আগে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে চেক
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা মো. আবদুল হান্নান মাস্টার ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।
এর মধ্যে ২১ হাজার ৮৭৫ টাকা পরিশোধ করার পর বাকি ২৮ হাজার ১২৫ টাকার বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিরাজগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন তিনি।
২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি চেকটি ব্যাংকে জমা দেওয়া হলে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায় চেকটি ডিজঅনার হয়।
আইনি নোটিশ দেওয়ার পরও পাওনা পরিশোধ না করায় একই বছর তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অনুপস্থিতিতেই বিচার
মামলাটি ২০১২ সালে সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আদালতে বিচারের জন্য স্থানান্তরিত হয়। আসামি পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়।
২০১৩ সালের ১৯ মার্চ আদালত আবদুল হান্নান মাস্টারকে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা জরিমানা করেন।
এরপর তিনি ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ক্রিমিনাল আপিল করেন এবং জামিনের আবেদন জানান। ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্ট তাকে এক বছরের জন্য জামিন দেন।
আপিল চলাকালে পুরো টাকা পরিশোধ
আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় আবদুল হান্নান মাস্টার ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে চেকের অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করেন।
এরপর চলতি বছরের ২১ জুলাই আবদুল হান্নান মাস্টার ও ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের মধ্যে একটি আপসনামা স্বাক্ষর হয়।
এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট কারাদণ্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন।
আদালতের নির্দেশ
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, মামলার তথ্য ও পারিপার্শ্বিকতা, অপরাধের মাত্রা এবং আপিলকারী কর্তৃক চেকের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বিষয় বিবেচনায় দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
তবে অর্থদণ্ড কমিয়ে চেকের মূল অঙ্ক অর্থাৎ ২৮ হাজার ১২৫ টাকা করা হয়েছে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, আপিলকারী ইতোমধ্যে বিচারিক আদালতে ১৪ হাজার ১০০ টাকা জমা দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে অবশিষ্ট অর্থ সরাসরি ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে পরিশোধ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট আদালতকে যথাযথ শনাক্তকরণ শেষে জমাকৃত ১৪ হাজার ১০০ টাকা ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
‘মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ’
ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ বলেন, আদালতের এ সিদ্ধান্তে আইনি সুবিচারের পাশাপাশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রয়োগ হয়েছে।
তার ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল পাওনা টাকা আদায় করা, কাউকে অহেতুক শাস্তি দেওয়া নয়। যেহেতু আপিলকারী পুরো অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং আপসনামায় স্বাক্ষর করেছেন, তাই কারাদণ্ড বাতিলের বিষয়ে তারা আপত্তি করেননি।
তিনি আদালতের সিদ্ধান্তকে ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত হিসেবে স্বাগত জানান।
সামালা টিভি | আইন ও আদালত ডেস্ক
