থাইল্যান্ডের বন্দরে পৌঁছেছে ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন; দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার প্রভাবেই কি এমন অবস্থা ?
সামালা টিভি | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘ ২৮৬ দিনের টানা সমুদ্রযাত্রা শেষে থাইল্যান্ডের একটি বন্দরে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিশাল বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন। তবে বন্দরে ভেড়ার পর জাহাজটির বাহ্যিক অবস্থা দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
প্রায় ১ হাজার ১০০ ফুট দীর্ঘ এই বিশাল যুদ্ধজাহাজটির সামনের অংশ থেকে শুরু করে পেছনের বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট দেখা গেছে মরিচার দাগ। বিশেষ করে পানির কাছাকাছি অংশে মরিচার ছাপ তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সামরিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২৮৬ দিনের দীর্ঘ অভিযান
বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ। দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রে সক্রিয় থাকার কারণে জাহাজটি বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক পরিবেশের সংস্পর্শে থাকে।
সমুদ্রের লবণাক্ত পানি, আর্দ্রতা, ঢেউ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে জাহাজের ধাতব অংশে ক্ষয় বা মরিচা ধরার স্বাভাবিক ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘ সময় বন্দরের বাইরে অবস্থান করলে এই প্রক্রিয়া আরও দৃশ্যমান হতে পারে।
২৮৬ দিনের অভিযানের পর থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর সময় রণতরীটির গায়ে সেই ক্ষয়ের চিহ্নই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
পানির কাছাকাছি অংশে বেশি মরিচা কেন?
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের পানিতে থাকা লবণ ধাতব পৃষ্ঠের ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশেষ করে জাহাজের যে অংশ পানির রেখার কাছাকাছি থাকে, সেটি বারবার পানি, বাতাস ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসে।
ফলে সেখানে দীর্ঘ সময় পর মরিচার দাগ দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।
একজন সামরিক বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো জাহাজ যদি টানা ৬০ দিন বা তার বেশি সময় সক্রিয়ভাবে সমুদ্রে থাকে, তাহলে পানির রেখার আশপাশে মরিচার চিহ্ন দেখা যেতে পারে।
সেই বিবেচনায় ২৮৬ দিনের দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের গায়ে মরিচা দেখা যাওয়াকে একেবারে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
এতে কি রণতরীর সক্ষমতা কমে গেছে?
রণতরীর গায়ে মরিচার দাগ দেখা গেলেই জাহাজটির যুদ্ধক্ষমতা বা কাঠামোগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আধুনিক যুদ্ধজাহাজগুলোতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পরিদর্শন এবং ক্ষয় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকে। বন্দরে পৌঁছানোর পর জাহাজের বিভিন্ন অংশ পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিষ্কার, রং করা ও মেরামত করা সামরিক রক্ষণাবেক্ষণের স্বাভাবিক অংশ।
তাই বাইরে থেকে জাহাজটিকে মরিচাধরা অবস্থায় দেখা গেলেও এর ভেতরের যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক ও যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলোর প্রকৃত অবস্থা আলাদা বিষয়।
দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার বাস্তব চিত্র
বিমানবাহী রণতরীগুলো সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের মতো শুধু যাতায়াতের জন্য সমুদ্রে থাকে না। দীর্ঘ সময় ধরে এগুলোকে পরিচালনা করতে হয় বিমান ওঠানামা, রসদ সরবরাহ, ক্রুদের কাজ এবং বিভিন্ন সামরিক কার্যক্রম।
ফলে নিয়মিত বন্দরে গিয়ে যে ধরনের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব, দীর্ঘ সমুদ্র অভিযানের সময় তার সুযোগ সীমিত থাকে।
এ কারণেই দীর্ঘদিন পর কোনো রণতরী বন্দরে ফিরলে তার গায়ে রং বিবর্ণ হওয়া, লবণের আস্তরণ কিংবা মরিচার দাগ দেখা যেতেই পারে।
বন্দরে পৌঁছানোর পর শুরু হবে রক্ষণাবেক্ষণ
থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো একটি বিশাল রণতরীর জন্য বন্দরে অবস্থানের সময় রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ তৈরি হয়।
জাহাজের বাহ্যিক অংশ পরিষ্কার করা, ক্ষয়প্রাপ্ত জায়গা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন করে রং ও প্রতিরোধক আবরণ দেওয়া—এসব কাজের মাধ্যমে জাহাজের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়।
অর্থাৎ, ২৮৬ দিনের সমুদ্রযাত্রার পর রণতরীটির গায়ে যে মরিচার চিহ্ন দেখা গেছে, সেটিকে আপাতত দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার দৃশ্যমান প্রভাব হিসেবেই দেখছেন সামরিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা
রণতরীটির মরিচাধরা চেহারার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনলাইনে নানা ধরনের মন্তব্য দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে মার্কিন নৌবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে সামরিক বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, শুধু বাহ্যিক মরিচার দাগ দেখে একটি বিমানবাহী রণতরীর সামগ্রিক সক্ষমতা কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের মান বিচার করা ঠিক নয়।
দীর্ঘ ২৮৬ দিনের সমুদ্রযাত্রার পর জাহাজটির বাহ্যিক অবস্থায় ক্ষয়ের চিহ্ন থাকা বরং সমুদ্র অভিযানের কঠিন পরিবেশেরই একটি দৃশ্যমান প্রতিফলন হতে পারে।
সামালা টিভি | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
