হরমুজ প্রণালির কাছে মার্কিন নৌযান ও জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
সাম্প্রতিক এই হামলায় ইরান ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেছে। একই সময়ে জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের কথাও জানিয়েছে তেহরান। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, হরমুজের কাছে চালানো হামলার কোনো ক্ষেপণাস্ত্র তাদের জাহাজে আঘাত করতে পারেনি।
‘নতুন প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র’ ব্যবহারের দাবি
ইরানের কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক হামলায় এমন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে যাতে ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল সেন্সর ও লক্ষ্য শনাক্তকরণ প্রযুক্তি রয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে জিপিএসের ওপর নির্ভরতা ছাড়াই চলমান লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও অনুসরণ করা সম্ভব বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এটিকে ইরানের কাসেম বাসির ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করছেন। তবে সাম্প্রতিক হামলায় ওই নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রই ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।
‘আমেরিকানদের জন্য জাহান্নাম তৈরি হয়েছিল’
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসিন রেজাইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের পর ‘আমেরিকানদের জন্য জাহান্নাম তৈরি হয়েছিল এবং তারা পালিয়ে গেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপের জবাব হিসেবেই তাদের এই পাল্টা অভিযান।
জর্ডানের মার্কিন ঘাঁটিতেও হামলা
হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত একটি ঘাঁটিতেও ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে আইআরজিসি।
জর্ডানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি প্রতিহত করা হয়েছে এবং বাকি দুটি জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে।
তবে পরবর্তী মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জর্ডানের ওই ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় কয়েকটি মার্কিন সামরিক বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ বিষয়ে মার্কিন পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্যও সামনে এসেছে।
পাঁচ ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংসের পর পাল্টা হামলা
এই উত্তেজনার সূত্রপাতের আগে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করার কথা জানিয়েছিল। ওয়াশিংটনের দাবি, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবেই এসব হামলা চালানো হয়।
এরপর আইআরজিসি হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করে। ইরানের দাবি করা জাহাজগুলোর মধ্যে দুটি মার্কিন জাহাজ এবং আটটি তেলবাহী জাহাজ ছিল। তবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, মার্কিন জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে চালানো হামলাগুলো ব্যর্থ হয়েছে।
হরমুজে বাড়ছে ঝুঁকি
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ১০ সেপ্টেম্বর প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল কমে মাত্র সাতটিতে নেমে আসে।
একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায় বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
রাশিয়া-চীনের সহায়তার প্রশ্ন
ইরানের নতুন লক্ষ্যভেদী প্রযুক্তির পেছনে রাশিয়া বা চীনের সহায়তা থাকতে পারে—এমন সম্ভাবনার কথা কিছু বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরিতে রাশিয়া বা চীনের সরাসরি সহায়তার স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ।
সামালা টিভি | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
