১২ বছরের শিশুসহ চারজনকে হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্য | প্রাথমিকভাবে ডাকাতির সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে পুলিশ
সামালা টিভি ডেস্ক:
রংপুর নগরীর মচুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২ বছরের এক শিশুও রয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
রোববার (২৩ আগস্ট) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার জানান, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
নিহত চারজন একই পরিবারের
নিহতরা হলেন—
- রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫)
- তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০)
- মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫)
- ছোট ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী (১২)
পুলিশ কমিশনার বলেন, চারজনের মরদেহ ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ১২ বছর বয়সী শিশু প্রিয়মকে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
শিশুটির মৃত্যুর কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, শিশুটির বয়স তাঁর নিজের সন্তানের কাছাকাছি হওয়ায় ঘটনাটি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ, মিলল চারজনের মরদেহ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না। বিষয়টি নিয়ে পরিবারের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে গণপতি চক্রবর্তীর এক শ্যালিকা বাড়িতে গিয়ে দেখেন, বাড়ির মূল দরজায় তালা দেওয়া। জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে ঘরের আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান তিনি। এরপর সন্দেহ হলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।
পরে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
যেভাবে মরদেহগুলো পাওয়া যায়
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুইতলা বাড়িটির ছাদ থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ পাওয়া যায় সিঁড়িতে। আর ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়মের মরদেহ পাওয়া যায় ঘরের খাটের নিচে।
ঘরের ভেতরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব আলামত থেকে ঘটনাটি ডাকাতির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাও করতেন গণপতি
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তী দীর্ঘদিন রংপুর জিলা স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। অবসরের পর তিনি নিজ বাসায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন।
পরিবারটির সঙ্গে স্থানীয়দের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও কয়েকদিন ধরে তাঁদের কাউকে দেখতে না পাওয়ায় সন্দেহ তৈরি হয়।
তদন্তে একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ
চারজনকে হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের পেছনে ডাকাতি, পূর্বশত্রুতা, পারিবারিক বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—সবকিছুই তদন্তের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বিশেষ করে—
- বাড়িতে প্রবেশের পথ ও দরজার তালা
- ঘরের ভেতরের আলামত
- পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোন ও যোগাযোগ
- আশপাশের মানুষের বক্তব্য
- সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শী
- ঘটনার আগে ও পরে এলাকায় চলাচলকারী ব্যক্তিদের তথ্য
এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
শিশু হত্যায় গভীর উদ্বেগ
একই পরিবারের চার সদস্যের মধ্যে ১২ বছরের শিশুকে হত্যার ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশও জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ বা কোনো ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে চাইছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সামালা টিভির বার্তা:
একটি পরিবারের চারজন মানুষের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। তবে তদন্তের স্বার্থে গুজব বা অনুমাননির্ভর তথ্য ছড়িয়ে না দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা জরুরি। অপরাধী যে-ই হোক, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিহত পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
