নিজস্ব প্রতিবেদক: পিরোজপুরে এক বীর মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজক সোহেল রানা। দাফনে বাধাদানকারী স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন, এই অপরাধীদের সর্বসমক্ষে গুলি করে হত্যা করা উচিত ছিল।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন কিংবদন্তি এই অভিনেতা।
ফেসবুকে যা লিখেছেন চিত্রনায়ক সোহেল রানা
নিজের স্ট্যাটাসে সোহেল রানা লিখেছেন—
"একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাকে কবর দেওয়ায় বাধা সৃষ্টি করল স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। হারিকেন জ্বালিয়ে তার আলোতে আলোকিত করে তার কন্যা সন্তান নিজ হাতে মাটি খুঁড়ে বাবার কবর তৈরি করল। আগের কবরটি স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা মাটি দিয়ে ভরাট করে দিয়েছে।"
সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আরও লেখেন—
"স্বাধীনতার স্বপক্ষীয় শক্তি নাকি বর্তমানে সরকার পরিচালনা করছে। কোনো আলামত তো দেখা গেল না, যারা বাধা দিয়েছিল তাদেরকে সর্বসমক্ষে গুলি করে হত্যা করা উচিত ছিল। সরকারের কাছে এর সঠিক জবাব চাই।"
মুক্তিযোদ্ধাদের বর্তমান অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, "মুক্তিযোদ্ধারা তো জীবনের শেষ প্রান্তে। কিন্তু আমরা বোধহয় মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যেতে ব্যর্থ হয়েছি। নইলে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ কোনোটা তো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। না ফেরার দেশে চলে যাবার আগে এমনি ধরনের সংবাদ আমার মতো অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তক্ষরণ করে।"
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনকে কেন্দ্র করে যা ঘটেছিল
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন এক অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মানিক পশারী (৮৭) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার অন্যতম প্রধান সাক্ষী ও বাদী ছিলেন। গত দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর শনিবার সকালে যশোরে মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তার দাফন ও জানাজাকে কেন্দ্র করে যে নাটকীয়তা ও বাধার সৃষ্টি হয়:
-
তোপের মুখে পরিবার: শনিবার দুপুর ১২টায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে মরহুমের মরদেহ নিয়ে গেলে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মী ও জনসাধারণের তোপের মুখে পড়ে পরিবার। পরে পুলিশের সহায়তায় মরদেহ পুলিশ লাইন্সে নেওয়া হয় এবং বিকেল ৫টার দিকে সেখানে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
-
ভরাট করে ফেলা হয় প্রথম কবর: স্থানীয়দের বাধার মুখে পরিবারের সদস্যরা প্রথমে কবর খুঁড়লেও দুর্বৃত্তরা বা স্থানীয় লোকজন সেই কবর আবার মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়।
-
মহিলাদের হাতে কবর খনন: গভীর রাতে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর ভয়ে বা স্থানীয় বিরোধের কারণে কোনো পুরুষ মানুষ দাফনকাজে এগিয়ে আসেননি। শেষ পর্যন্ত নিহতের স্ত্রী, মেয়ে ও বোন নিজ হাতে হারিকেনের আলোতে কবর খুঁড়ে রাত ২টার দিকে তাঁকে চিরশায়িত করেন।
SAMALA TV-র পর্যবেক্ষণ
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পরও তাঁর শেষ বিদায়ে এমন নজিরবিহীন সামাজিক বাধা এবং নিজ হাতে পরিবারের নারীদের কবর খোঁড়ার দৃশ্য গোটা জাতিকে স্তম্ভিত ও লজ্জিত করেছে। অভিনেতা সোহেল রানার ক্ষোভ এবং সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিক্রিয়া এটাই প্রমাণ করে যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মরহুমের শেষ সম্মানের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস বা ছাড় কাম্য নয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে এমন অবমাননাকর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছে সচেতন মহল।
SAMALA TV | দেশ ও মানুষের কথা বলে...
