সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: বয়স্কভাতার কার্ড করিয়ে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে এক মানসিক প্রতিবন্ধী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বৃদ্ধের ১৪ শতক ফসলি জমি লিখে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার কয়ড়া ইউনিয়নের বাঘলপুর গ্রামে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় অভিযুক্ত হয়েছেন সাবেক এক ইউপি সদস্য ও তাঁর ভাইয়েরা। সহায়-সম্বলহীন বৃদ্ধের ওপর এহেন জালিয়াতির ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ছলচাতুরী ও প্রতারণার ঘটনা
ভুক্তভোগী আজিজুল হক (৮৫) বাঘলপুর গ্রামের মৃত মফিজ সরকারের ছেলে। তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে চোখেও দেখতে পান না।
আজিজুল হকের ছেলে মো. ফারুক সরকার অভিযোগ করে জানান, তাঁদের বসতবাড়ি ছাড়া সহায়-সম্পত্তি বলতে বাঘলপুর মৌজায় মাত্র ২৩ শতক ফসলি জমি অবশিষ্ট রয়েছে। গত ৪ অক্টোবর তাঁর চাচাতো ভাই তথা সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে অন্যান্য ভাইয়েরা বয়স্কভাতার কার্ড বানিয়ে দেওয়ার কথা বলে আজিজুল হককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান।
-
ভাতার টাকার নামে প্রতারণা: জমি রেজিস্ট্রির আগে বয়স্কভাতার টাকা বলে বৃদ্ধের হাতে ২০, ৫০ ও ১০০ টাকার নোটে মাত্র ৫ হাজার টাকা গুঁজে দেওয়া হয়।
-
গোপনে টিপসই গ্রহণ: মানসিক প্রতিবন্ধী হওয়ার সুযোগ নিয়ে তাঁকে উল্লাপাড়ার ঝিকিড়া মহল্লার একটি গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে দলিলে টিপসই নেওয়া হয়। পরে পরিবার জানতে পারে যে, ভাতার কার্ড নয়—বরং দলিলে টিপসই নিয়ে ১৪ শতক জমি লিখে নেওয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত ও জড়িতদের বক্তব্য
-
সাবেক ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ: অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, “চাচা আজিজুল হককে ৭ লাখ টাকা দিয়ে তাঁর সম্মতিতেই নিয়ম মেনে জমি কেনা হয়েছে। ভাতার কার্ডের কথা বলে জমি নেওয়ার অভিযোগ মিথ্যা।”
-
দলিল লেখক আবদুল মতিন: তিনি ভুল স্বীকার করে বলেন, “বৃদ্ধের মানসিক ভারসাম্যহীনতার কথা আমি জানতাম না। ক্রেতারা কাগজপত্র জমাদানে দলিল তৈরি করতে বলেছিলেন। পরে অবৈধ জালিয়াতির বিষয়টি জানতে পারি।”
-
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল নাঈম: তিনি জানান, অসুস্থ ব্যক্তির জমি রেজিস্ট্রির আবেদনের ভিত্তিতে ঝিকিড়া মহল্লার এক বাড়িতে গিয়ে তিনি নিয়ম অনুযায়ী দলিলে টিপসই নেন। তবে জালিয়াতির বিষয়টি তিনি তখন বুঝতে পারেননি।
সাব-রেজিস্ট্রার ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর উল্লাপাড়া সাব-রেজিস্ট্রার ফারহানা আজিজ জানান, অসুস্থতার সনদ ও কমিশনের আবেদনের ভিত্তিতে নিয়ম অনুযায়ী প্রতিনিধি পাঠানো হয়েছিল। তবে ছলচাতুরীর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর দলিল লেখক আবদুল মতিনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশের জবাব না দেওয়ায় তাঁকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এদিকে, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রায়হানুল ইসলাম বলেন, “মানসিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধের জমি জালিয়াতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। ছুটি শেষে দপ্তর খোলামাত্রই জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
SAMALA TV-র মানবিক পর্যবেক্ষণ
অসহায়, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও মানসিক অসুস্থ একজন বৃদ্ধ মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার এই চেষ্টা কেবল অপরাধ নয়, এটি চরম অমানবিকতা। সামালা টিভি মনে করে—প্রশাসনের উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অবিলম্বে এই অবৈধ দলিল বাতিল করা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় এনে ভুক্তভোগী পরিবারের জমি ফিরিয়ে দেওয়া।
