ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চরম উত্তেজনার পারদ এবার স্পর্শ করেছে বিশ্ব যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট ক্যাবলকে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে যাওয়া প্রধান প্রযুক্তি ও টেলিকম অবকাঠামোতে হামলার সরাসরি হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তবে এই আশঙ্কাজনক পদক্ষেপে ইরানসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়বে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে কাতার।
হামলার হুমকি ও আইআরজিসির বক্তব্য
সোমবার (১৯ অক্টোবর) তেহরানের স্যাক্রেড ডিফেন্স জাদুঘরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ হুমকির কথা জানান আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি।
-
ক্যাবল ও ডেটা প্রবাহ: মোহেব্বি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালির তলদেশ দিয়ে অন্তত সাতটি প্রধান ডেটা যোগাযোগ ক্যাবল অতিক্রম করেছে, যার মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের ইন্টারনেট ও বাণিজ্যিক ডেটা পরিবাহিত হয়।
-
নতুন অস্ত্র ও লক্ষ্যবস্তু: তিনি সরাসরি সতর্ক করে বলেন, "আমরা শুধু জানাতে চাই, নতুন লক্ষ্যবস্তু প্রকাশ করা হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষে নতুন অস্ত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটবে।"
-
মার্কিন প্রভাব দূর করার অঙ্গীকার: মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও প্রভাব সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করার অঙ্গসংকল্প ব্যক্ত করেন এই সামরিক মুখপাত্র।
পটভূমি: গত মার্চের শুরুতে ড্রোন হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও বাহরাইনে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (AWS) অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে সরাসরি ক্লাউড সেবা বন্ধ হয়ে প্রযুক্তি খাতে বিশাল বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল। এর পরপরই সরাসরি সাবমেরিন ক্যাবলে আঘাত হানার এই নতুন হুমকি এলো।
কাতারের প্রতিক্রিয়া: সাধারণ মানুষ ও এই অঞ্চলের অর্থনীতিই পড়বে চরম ঝুঁকিতে
আইআরজিসির এই হুমকির পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়।
কাতারের গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক ইব্রাহিম আল-হাশমি বলেন:
-
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কারা? কোনো হামলা বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল নয়, বরং ইরানসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের সাধারণ জনগণ ও দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
-
সংযমের আহ্বান: কাতার তাৎক্ষণিকভাবে যেকোনো ধরনের হুমকি ও হামলা বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছে এবং আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক প্রভাব
টেলিযোগাযোগ তথ্য বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফি-র তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডেটা পরিবহনের ৯০ শতাংশেরও বেশি সক্ষমতা লোহিত সাগর ও সংলগ্ন অঞ্চলের তলদেশ দিয়ে যাওয়া সাবমেরিন ফাইবার-অপটিক ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল।
এর আগে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়িও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পুরো অঞ্চলের ক্যাবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অবকাঠামো আক্রমণের মুখে পড়তে পারে।
সামালা টিভির বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ
যুদ্ধ বা সংঘাত কখনোই সাধারণ মানুষের জন্য সুফল আনে না। সমুদ্রের তলদেশের এই ডিজিটাল জীবনরেখা ক্ষতিগ্রস্ত হলে থমকে যাবে শিক্ষা, বাণিজ্য, চিকিৎসাসহ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনব্যবস্থা। সামালা টিভি মনে করে, ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াইয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মানুষের জীবনযাত্রা যেন কোনোভাবেই বিপর্যস্ত না হয়—বিশ্বনেতাদের সেদিকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
