বরিশালের উজিরপুরে ভাইরাল ভিডিও ঘিরে চাঞ্চল্য
সামালা টিভি ডেস্ক:
বরিশালের উজিরপুরে চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি ধরা পড়েছে একটি ভিডিওতে—বাবাকে বেঁধে রাখার পর মাত্র ৯ বছরের ছোট্ট মেয়েটি বাবার মুখে তুলে দিচ্ছে খাবার। কখনো রুটি, কখনো চায়ে ভিজিয়ে ফুঁ দিয়ে বাবাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে শিশুটি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, একটি খুঁটির সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় রয়েছেন এক ব্যক্তি। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছোট্ট মেয়েটি বাবার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। শিশুটির আচরণে ফুটে উঠেছে ভয়, অসহায়ত্ব আর বাবার প্রতি গভীর মমতা।
ঘটনাটি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বামরাইল এলাকার বলে জানা গেছে। মারধরের শিকার ব্যক্তির নাম অনিক সরদার।
চুরির অভিযোগে আটক
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অনিক সরদারের বিরুদ্ধে এর আগেও চুরির অভিযোগ উঠেছিল। সর্বশেষ ঘটনার ক্ষেত্রে স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তিনি গভীর রাতে পাশের একটি বাড়িতে ঢুকে জানালা দিয়ে একটি মোবাইল ফোন নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এ সময় বাড়ির লোকজন তাকে আটক করেন।
তবে ভাইরাল ভিডিওতে যে ব্যক্তিকে মারধর করতে দেখা যাচ্ছে, তাকে কেন পুলিশের কাছে না দিয়ে এভাবে প্রকাশ্যে বেঁধে রাখা ও মারধর করা হলো—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্ত্রীর অভিযোগ, রয়েছে জমি নিয়ে বিরোধ
অনিক সরদারের স্ত্রী অভিযোগ করেছেন, তার স্বামীকে যারা ধরে নিয়ে গিয়ে মারধর করেছেন, তাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তাঁর দাবি, চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে মারধরের পাশাপাশি পুরোনো বিরোধেরও প্রভাব থাকতে পারে।
তিনি কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ করেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘আগেও ছেড়ে দিয়েছি’—অভিযুক্তের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে আয়াত খন্দকার বলেন, অনিককে এর আগেও কয়েকবার চুরির অভিযোগে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এবার তাকে ধরে ‘গণধোলাই’ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তবে তাঁর দাবি, অনিককে মেয়ের সামনে মারধর করা হয়নি।
অন্যদিকে, ভাইরাল ভিডিওতে শিশুটিকে বাবাকে খাবার খাওয়াতে দেখা যাওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
পুলিশ কী বলছে?
উজিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভিডিওটি নজরে আসার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে অনিকের স্বজনদের কাছ থেকে মুচলেকা রেখে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বর্তমানে অনিক সরদার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানা গেছে।
বাবাকে খাওয়ানো সেই শিশুটিও আতঙ্কে
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে অনিকের ৯ বছরের মেয়েটি। ভিডিওতে দেখা যায়, চারপাশে মানুষজনের উপস্থিতির মধ্যেও সে বাবার মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে। রুটি চায়ে ভিজিয়ে, ফুঁ দিয়ে বাবাকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে সে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর শিশুটি ভীত হয়ে পড়েছে। বাড়িতে খুব একটা কথা বলছে না।
একটি শিশুর চোখের সামনে তার বাবাকে বেঁধে রাখা, আর সেই অবস্থায় শিশুটির বাবাকে খাবার খাওয়ানোর দৃশ্যটি ঘটনাটিকে শুধু একটি চুরির অভিযোগের বিষয় হিসেবে নয়, বরং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, শিশুর মানসিক নিরাপত্তা এবং মানবিক আচরণ নিয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে সামনে এনেছে।
চুরি হয়ে থাকলেও আইন নিজের হাতে নেওয়ার সুযোগ নেই
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ থাকলে আইন অনুযায়ী তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ সত্য কি না, সেটি তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করার বিষয়।
অভিযোগ প্রমাণের আগেই কাউকে বেঁধে রেখে মারধর করা বা প্রকাশ্যে শাস্তি দেওয়া আইনসম্মত পদ্ধতি নয়। একই সঙ্গে এমন ঘটনার সময় শিশুদের সামনে সহিংসতা ঘটলে তার মানসিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
সামালা টিভির মূল কথা—“দেশ ও মানুষের কথা বলে…”
এই ঘটনাও সেই প্রশ্নই সামনে আনে—অপরাধের অভিযোগ থাকলেও বিচার কি জনতার হাতে, নাকি আইনের মাধ্যমে হওয়া উচিত?
