পিস্তল-ছুরি দেখিয়ে জোর করে সিএনজিতে তোলার অভিযোগ শিক্ষিকার | চলন্ত সিএনজি থেকে লাফ দিয়ে রক্ষা পাওয়ার দাবি | অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তের
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় এক স্কুলশিক্ষিকাকে জোর করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে কসবা পশ্চিম ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন জিন্নাহর বিরুদ্ধে।
ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে উপজেলার কসবা পশ্চিম ইউনিয়নের আকছিনা গ্রামে। ঘটনার পর ওই শিক্ষিকা কসবা থানায় দেলোয়ার হোসেন জিন্নাহর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগটি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
স্কুল ছুটির পর পথরোধের অভিযোগ
অভিযোগকারী শিক্ষিকার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের মতো সোমবার স্কুল ছুটির পর তিনি বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। আকছিনা গ্রামের একটি এলাকায় পৌঁছালে দেলোয়ার হোসেন জিন্নাহ তার পথরোধ করেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দেলোয়ার ব্যক্তিগত বিষয়ে কথা বলতে চান। কিন্তু শিক্ষিকা কথা বলতে রাজি না হয়ে সেখান থেকে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে তিনি ভয়ভীতি দেখান।
শিক্ষিকার দাবি, এ সময় দেলোয়ার একটি কালো রঙের পিস্তল বের করে তাকে ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সিএনজিতে দেলোয়ারের সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় আরেক ব্যক্তি শিক্ষিকার মুখ চেপে ধরেন। একপর্যায়ে তার গলায় ধারালো ছুরি ধরে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষিকা।
চলন্ত সিএনজি থেকে লাফ দেওয়ার দাবি
শিক্ষিকার অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে নিয়ে সিএনজিটি কুল্লাবাড়ি জোড়া ব্রিজের দিকে যাওয়ার সময় তিনি সুযোগ বুঝে চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দেন।
এরপর তার চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে আসেন এবং তাকে উদ্ধার করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারী শিক্ষিকার দাবি, তাকে পুনরায় সিএনজিতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও স্থানীয়দের উপস্থিতিতে তা সম্ভব হয়নি। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়িতে নিয়ে যান।
‘আমার সঙ্গে তার এক মাসের সম্পর্ক ছিল’
তবে শিক্ষিকার আনা অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন দেলোয়ার হোসেন জিন্নাহ।
অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতার দাবি, ওই শিক্ষিকার সঙ্গে তার প্রায় এক মাসের সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কের বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
তার দাবি, অপহরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বরং শিক্ষিকার রাগ কমানোর জন্যই তাকে সিএনজিতে করে কিছুক্ষণ ঘোরানো হয়েছিল।
দেলোয়ারের ভাষ্য, তার বিরুদ্ধে আনা অপহরণের অভিযোগ ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ এবং রাজনৈতিকভাবে তার সম্মান ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযোগ করা হয়েছে।
শিক্ষিকার পাল্টা বক্তব্য
অন্যদিকে ওই শিক্ষিকা দেলোয়ারের সম্পর্কের দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছেন।
তার বক্তব্য, দেলোয়ারের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কের বিষয়টি সত্য নয়। বাড়ি ফেরার পথে দেলোয়ার তার পথরোধ করে কথা বলতে চান। তিনি রাজি না হওয়ায় পিস্তল দেখিয়ে তাকে জোর করে সিএনজিতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
শিক্ষিকা আরও বলেন, ঘটনার পর তিনি ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি যেকোনো সময় তাদের ক্ষতি করতে পারেন—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
স্কুল কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আকছিনা-কুল্লাবাড়ি মডার্ন স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি খন্দকার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, শিক্ষিকা থানায় অভিযোগ করেছেন। স্কুলের পক্ষ থেকেও স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ কাজ করবে।
পুলিশের বক্তব্য
কসবা থানার অফিসার ইনচার্জ আলী মোহাম্মদ রাশেদ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় থানায় একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের তদন্ত চলছে। শিক্ষিকার অভিযোগে পিস্তল ও ছুরি ব্যবহারের যে দাবি করা হয়েছে, সেগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। একইভাবে অভিযুক্তের দাবি করা ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টিও তদন্তে যাচাই হওয়ার বিষয়।
অভিযোগ, পাল্টা দাবি—সত্যতা মিলবে তদন্তে
একদিকে শিক্ষিকার অভিযোগ—পথরোধ করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাকে জোর করে সিএনজিতে তুলে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতার দাবি—অপহরণ নয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে রাগ কমাতেই তাকে নিয়ে সিএনজিতে ঘুরেছেন তিনি।
দুই পক্ষের বক্তব্যে রয়েছে স্পষ্ট ভিন্নতা। তাই ঘটনাটির প্রকৃত কারণ কী, অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা আছে কি না এবং সেখানে আর কেউ জড়িত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন পুলিশের তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
অভিযোগের সত্যতা আদালত বা তদন্তে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত দেলোয়ার হোসেন জিন্নাহর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
সামালা টিভি | ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি
