আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দুর্নীতি কেলেঙ্কারিগুলোর একটি আবারও সামনে এসেছে। ফিফার বিভিন্ন টুর্নামেন্টের লাভজনক মিডিয়া ও বিপণন স্বত্ব পেতে আন্তর্জাতিক ফুটবল কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন আর্জেন্টিনার দুই ক্রীড়া বিপণন কর্মকর্তা।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন হুগো জিনকিস ও তার ছেলে মারিয়ানো জিনকিস। এই সমঝোতার আওতায় তারা নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা প্রতারণার অভিযোগের বিষয়ে দায় স্বীকার করেছেন এবং ৫ কোটি মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্ত করতে সম্মত হয়েছেন।
কীভাবে সামনে এলো কেলেঙ্কারি?
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ব্যাপক তদন্তের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুর্নীতির একটি বড় নেটওয়ার্কের তথ্য সামনে আসে। তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ফুটবলের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা, উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল কনফেডারেশন কনকাকাফ এবং দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশন কনমেবল।
তদন্তের একপর্যায়ে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার কয়েকজন কর্মকর্তার কার্যালয়েও অভিযান চালানো হয়। এরপর একের পর এক ফুটবল কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন। অনেকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন, আবার কেউ কেউ বিভিন্ন অভিযোগ স্বীকার করেন।
এই দীর্ঘ তদন্তের ধারাবাহিকতায় এবার অভিযুক্ত হয়েছেন আর্জেন্টিনার ক্রীড়া বিপণন প্রতিষ্ঠান ফুল প্লে-এর সহ-মালিক হুগো জিনকিস ও তার ছেলে মারিয়ানো জিনকিস।
কোটি কোটি ডলারের ঘুষের অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, জিনকিসরা স্বীকার করেছেন যে তারা ফুটবল কর্মকর্তাদের কয়েক কোটি ডলার বাণিজ্যিক ঘুষ দেওয়ার একটি পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুষের বিনিময়ে তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ ও টুর্নামেন্টের লাভজনক সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সমর্থন নিশ্চিত করেছিলেন।
বিশেষ করে বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও কোপা আমেরিকাসহ গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতার মিডিয়া স্বত্ব পাওয়ার জন্য এই ঘুষের অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচার এড়ানোর সুযোগ
জিনকিসদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রসিকিউটরদের হওয়া সমঝোতাটি হলো ‘ডিফার্ড প্রসিকিউশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ডিপিএ।
এই ধরনের চুক্তির আওতায় অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট শর্ত মেনে চললে প্রসিকিউশন স্থগিত বা প্রত্যাহারের সুযোগ পেতে পারে।
এই চুক্তির অংশ হিসেবে জিনকিসরা তাদের বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগের বিষয়ে দায় স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি ৫ কোটি মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্ত করতেও সম্মতি দিয়েছেন।
ফুটবল স্বত্বের পেছনে বড় অর্থের খেলা
আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় টুর্নামেন্টগুলোর সম্প্রচার ও বিপণন স্বত্ব অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। কোটি কোটি দর্শককে ঘিরে এসব স্বত্বের বাজারমূল্যও বিপুল।
অভিযোগ অনুযায়ী, জিনকিসরা বৈধ প্রতিযোগিতার বদলে ঘুষের মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসায়িক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছিলেন।
ফলে এই মামলাটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগ নয়; বরং আন্তর্জাতিক ফুটবলের বাণিজ্যিক স্বত্ব কীভাবে ঘুষ ও প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল—তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
২০১৫ সালের ফিফা কেলেঙ্কারির রেশ
২০১৫ সালে ফিফাকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিভিন্ন দেশের ফুটবল কর্মকর্তা ও ক্রীড়া বিপণন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ঘুষ, অর্থপাচার, প্রতারণা এবং অবৈধভাবে সম্প্রচার স্বত্ব বণ্টনের মতো অভিযোগ ওঠে।
এরপর দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ফুটবল কর্মকর্তা সাজা পেয়েছেন বা বিভিন্ন অভিযোগে দোষ স্বীকার করেছেন।
জিনকিস বাবা-ছেলের এই স্বীকারোক্তি সেই দীর্ঘ তদন্তেরই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে সামনে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফুটবলের মাঠের প্রতিযোগিতার বাইরে সম্প্রচার, বিপণন ও বাণিজ্যিক স্বত্বকে ঘিরে যে বিশাল অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করে, সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সামালা টিভি | আন্তর্জাতিক সংবাদ
