যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকির জবাবে তেহরানের কড়া বার্তা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও সতর্কতা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সামালা টিভি
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যে আরও কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তেহরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, অর্থনৈতিক যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি দিয়ে এক ফোঁটা তেলও রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।
ইরানের এমন বক্তব্যের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কায় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা।
অর্থনৈতিক যুদ্ধকে যুদ্ধ হিসেবেই দেখবে তেহরান
রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় অর্থনৈতিক প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলতে থাকলে হরমুজ প্রণালি কিংবা পারস্য উপসাগরের অন্য কোনো পথ দিয়েও তেল রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না।
ইরানের এই কর্মকর্তা আরও সতর্ক করে বলেছেন, কোনো দেশ যদি ইরানের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধে অংশ নেয় বা ওয়াশিংটনের পদক্ষেপকে সমর্থন করে, তাহলে তেহরান সেই দেশকেও সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েও সতর্কতা
শুধু তেল রপ্তানি নয়, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও নতুন সতর্কতা জারি করেছে ইরান।
তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে প্রায় ৪৫টি জাহাজকে নিয়ম লঙ্ঘনকারী হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে ইরান।
এসব জাহাজের সঙ্গে পণ্য স্থানান্তর কিংবা জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’
ইরানের হুমকির মধ্যেই তেহরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করা হবে। এর আগে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি আসন্ন পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
বেসেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আর্থিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোকেও নতুন মার্কিন পদক্ষেপের আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
অর্থাৎ, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পরিধি শুধু তেহরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যস্থতায় তেহরানে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির ইরান সফর করছেন। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখার উদ্দেশ্যে তার এই সফর বলে জানিয়েছে পাকিস্তান।
সফরে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়।
ফলে ইরান যদি সত্যিই এই পথে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেয় বা জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।
এর প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও।
সংঘাত বাড়লে বিশ্ব অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। তেলের দাম বেড়ে গেলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ও উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সামরিক সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ
ইরান সাম্প্রতিক সংঘাতে সামরিক সক্ষমতার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি থাকলেও দেশটির হাতে এখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই সক্ষমতা ব্যবহার করে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা চালানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে চাপ সৃষ্টি করতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
সামনে কোন পথে যাবে পরিস্থিতি?
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে ইরান সরাসরি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। এর মধ্যেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ পরিস্থিতিকে কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়ার একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি করেছে।
তবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাহত হয়, তাহলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
এখন আন্তর্জাতিক মহলের মূল নজর—তেহরান ও ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির দিকে।
